একটি বেসরকারি আবহাওয়া পূর্বাভাস ওয়েবসাইট যা বাংলা ভাষায় আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রদান করে থাকে একাধিক আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল, কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ ও রাডার থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে।

Breaking News :

২০০৪ সালের সুমাত্রা মেগাথ্রাস্ট ভূমিকম্প ও বক্সিং-ডে সুনামি: প্রভাব, শিক্ষা ও আধুনিক সুনামি সতর্কতা ব্যবস্থার বিবর্তন

Blog Image
Email : 47k 12k

বক্সিং-ডে সুনামি ২০০৪: প্রভাব, শিক্ষা ও আধুনিক সুনামি সতর্কতা ব্যবস্থার বিবর্তন

২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর, স্থানীয় সময় সকাল ৭:৫৮ মিনিটে, ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের পশ্চিম উপকূলের বাইরে সমুদ্রে একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। ভূমিকম্পটির শক্তি ছিল ৯.১ মাত্রা, যা এটিকে ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্পে পরিণত করে।

এই ভূমিকম্পটি সমুদ্রের নিচে হওয়ায় সরাসরি বাড়িঘর বা শহরে খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। এই মেগাথ্রাস্ট ভূমিকম্পের ফলে সমুদ্রতলের কিছু অংশ প্রায় ২০ মিটার পর্যন্ত উঁচু বা নিচু হয়ে যায়, যার ফলে সমুদ্রের পানির পুরো কলাম স্থানচ্যুত হয় এবং উৎপন্ন হয় ভয়াবহ সুনামি। সুনামি হলো বিশাল সমুদ্রের ঢেউ, যা খুব দ্রুত উপকূলের দিকে এগিয়ে আসে।

কিছু জায়গায় এই সুনামির ঢেউয়ের উচ্চতা ৩০ মিটার পর্যন্ত ছিল, যা একটি ১০ তলা ভবনের সমান। এই ঢেউ ভারত মহাসাগরের চারপাশের অনেক দেশের উপকূলে আঘাত করে এবং বড় ধরনের প্লাবন সৃষ্টি করে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই সুনামির কারণে ১ লাখ ২৬ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যান এবং ৯৪ হাজার মানুষ নিখোঁজ হন। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী সুনামিগুলোর একটি।



ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল সমুদ্রতলের প্রায় ৩০ কিলোমিটার গভীরে। সেখানে ভারতীয় প্লেট ধীরে ধীরে সুন্দা প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় সাবডাকশন। এই চাপের কারণেই হঠাৎ করে ভূমিকম্প ঘটে। ভূমিকম্পটি একসঙ্গে পুরো এলাকায় হয়নি। এটি দক্ষিণ দিক থেকে শুরু হয়ে প্রায় ৮–১০ মিনিটে ধীরে ধীরে ১,৫০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সমুদ্রতলের কিছু অংশ প্রায় ২০ মিটার ওপরে বা নিচে উঠে যায়।

সহজভাবে মনে করা যেতে পারে যেন সমুদ্রের নিচে একটি বিশাল জায়গা হঠাৎ করে উঠিয়ে বা নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে করে সমুদ্রের পানির বড় অংশ স্থানচ্যুত হয় এবং সেই পানিই বিশাল ঢেউ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই ঢেউ পূর্ব দিকে সুমাত্রার দিকে এবং পশ্চিম দিকে ভারত ও শ্রীলঙ্কার দিকে যায়। অনেক দূরে যাওয়ার পর উপকূলে পৌঁছালে ঢেউগুলো আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তাই সুমাত্রা থেকে অনেক দূরে থাকা শ্রীলঙ্কায়ও হাজার হাজার মানুষ মারা যান।



২০০৪ সালের সুমাত্রা মেগাথ্রাস্ট ভূমিকম্প ও সুনামি বৈশ্বিকভাবে একটি বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক ও নীতিগত টার্নিং পয়েন্ট তৈরি করে। এই ঘটনার পর বিশ্ব বুঝতে পারে যে সমুদ্রের নিচে সংঘটিত বড় ভূমিকম্প (বিশেষ করে সাবডাকশন জোনে) অল্প সময়ের মধ্যেই অত্যন্ত বিধ্বংসী সুনামি সৃষ্টি করতে পারে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে আগাম সতর্কতা (early warning) ও দুর্যোগ প্রস্তুতির গুরুত্ব নতুন করে সামনে আসে।

এই ঘটনার পরবর্তী এক দশকে সুনামি উৎপত্তি, বিস্তার ও উপকূলে আঘাতের প্রক্রিয়া বোঝার জন্য বিশ্বজুড়ে ব্যাপক গবেষণা শুরু হয়। একই সঙ্গে গড়ে তোলা হয় আধুনিক সুনামি সতর্কতা ব্যবস্থা (Tsunami Early Warning System, TEWS)। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা (বিশেষ করে UNESCO–IOC) এর নেতৃত্বে পৃথিবীর বিভিন্ন সাগর ও মহাসাগরে বৈশ্বিক সুনামি পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়।

এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো Seismic Network। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত উচ্চ সংবেদনশীল সিসমোমিটার ব্যবহার করে ভূমিকম্পের অবস্থান, গভীরতা, মাত্রা এবং ফল্টের ধরন (strike-slip, thrust ইত্যাদি) খুব দ্রুত নির্ণয় করা হয়। কোনো বড় সাবডাকশন-জোন ভূমিকম্প শনাক্ত হলেই সম্ভাব্য সুনামি তৈরির ঝুঁকি মূল্যায়ন শুরু হয়।

তবে শুধু ভূমিকম্প শনাক্ত করলেই সুনামি নিশ্চিত করা যায় না। এজন্য ব্যবহৃত হয় DART buoy (Deep-ocean Assessment and Reporting of Tsunamis) ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় সমুদ্রের গভীরে থাকা Bottom Pressure Recorder (BPR) সমুদ্রতলের পানির চাপের খুব সূক্ষ্ম পরিবর্তন পরিমাপ করে। সুনামি তরঙ্গ সমুদ্রের গভীর দিয়ে অতিক্রম করলে এই চাপ পরিবর্তনের মাধ্যমে সেটি শনাক্ত করা যায়। এরপর তথ্য স্যাটেলাইটের মাধ্যমে রিয়েল-টাইমে সতর্কতা কেন্দ্রে পাঠানো হয়।

Seismic network ও DART buoy–এর তথ্য একত্র করে সংখ্যাতাত্ত্বিক মডেল (numerical tsunami models) চালানো হয়, যা দিয়ে ঢেউয়ের উচ্চতা, গতি এবং কোন উপকূলে কখন আঘাত হানতে পারে তা পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয়। এর ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে সুনামি সতর্কতা, উপকূলীয় সরিয়ে নেওয়া (evacuation) এবং জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

২০০৪ সালের পর এই আধুনিক প্রযুক্তি ও সমন্বিত ব্যবস্থার ফলে পরবর্তী বহু বড় সমুদ্রভিত্তিক ভূমিকম্পে সৃষ্ট সুনামি থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। তাই ২০০৪ সালের সুমাত্রা ভূমিকম্প শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি আধুনিক সুনামি বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ভিত্তি গড়ে দেওয়া একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।

Related Post